বছরে দুই লাখ মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব এতে আদালতে মামলার চাপ ৪০ শতাংশ কমবে

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার মাধ্যমে নিষ্পত্তি ৩৫ হাজার মামলা
বিচারকাজে বিড়ম্বনা, সময় ও খরচ কমানোই আমার প্রধান লক্ষ্য : আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল
বিশেষ প্রতিবেদক : আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, অনেক হয়রানিমূলক, বিদ্বেষমূলক মামলা হচ্ছে। অন্যের জায়গা-জমি ও ব্যবসা দখল করার জন্যও মামলা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার পুলিশ-আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকার দেওয়ার চেষ্টা করছে। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, দেশে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ মামলা হয়। আর জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয় ৩৫ হাজার মামলা। সংস্থাটিতে বছরে দুই লাখ মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হলে আদালতে মামলার চাপ কমপক্ষে ৪০ শতাংশ কমে যাবে। এজন্য ছোট ছোট মামলা লিগ্যাল এইড হয়ে আদালতে আসতে হবে। আসিফ নজরুল আরো বলেন, দেশে পারিবারিক বা জমিজমা নিয়ে অনেক দ্ব›দ্ব লেগে থাকে। এসবের অভিযোগ সরাসরি আদালতে না এনে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সমাধান করা যায়। নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ হলে আদালতে আসতে হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে লিগ্যাল এইড প্রতিষ্ঠানটি আরও উন্নীত করা হবে বলেও জানান আইন উপদেষ্টা। এখান থেকেই যেন এই ছয় মাসে ১ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। গত সোমবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবসের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন আইন উপদেষ্টা। আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের আইনে কোথাও তো মামলা করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা দেওয়া নেই। যে যার মতো মামলা করছে। এখানে অনেক হয়রানিম‚লক মামলা হচ্ছে, বিদ্বেষমূলক মামলা হচ্ছে, অন্যের জায়গা-জমি দখল, ব্যবসা দখল করার জন্য মামলা হচ্ছে। এগুলো অত্যন্ত আনফরচুনেট (দুর্ভাগ্যজনক), অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। মামলা করে ফেলার পর পুলিশ-আদালত প্রশাসনের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন ধরনের প্রতিকার দেওয়ার চেষ্টা করছি। যখন এত বেশি লোককে আসামি করা হয়, এত মামলা করা হয়, আমাদের জন্যও কঠিন হয়ে যায়।’
আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাগুলোতে সেবা দেয়ার জন্য বিচারকের অপ্রতুলতার কথা তুলে ধরে আইন উপদেষ্টা বলেন, আমাদের জেলা আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা অফিসগুলোতে বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়ে তিনজন করার চিন্তা করছি। আমাদের হিসাব মতে, দেশে এখনো কয়েক হাজার অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ রয়েছেন, যারা এখনো কাজের জন্য পারদর্শী, বিচারিক কাজে তাঁদের রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যা মানুষকে লিগ্যাল এইডে আস্থা রাখতে বড় ভ‚মিকা পালন করবে। তাঁদেরকে আমরা এখানে সংযুক্ত করার চিন্তা করছি। এটা করা গেলে আগামী ছয়মাস আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাগুলো এমন পর্যায়ে চলে যাবে যেখানে বছরে ১ লাখ মামলা পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এভাবে ধাপে-ধাপে আগামী একবছরের মধ্যে ২ লাখ মামলা পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আমরা করে যাবো।
আইন উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোতে মাত্র একজন করে সহকারী/সিনিয়র সহকারী জজ পদমর্যাদার বিচারক কাজ করছেন। কাজের গতি বাড়াতে এসব অফিসে একজন সিনিয়র সহকারী জজ ছাড়াও একজন যুগ্ম জেলা জজ এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ নিয়োগ দেওয়া হবে।
অধ্যাপক আসিফ বলেন, মামলা হওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে অভিযোগের কোনো বস্তুনিষ্ঠতা পাওয়া না গেলে কাউকে যেন গ্রেপ্তার না করা হয়। আবার আদালতের পক্ষ থেকেও যেখানে বস্তুনিষ্ঠতা নেই, সেখানে যতভাবে আইনগত প্রতিকার দেওয়া সম্ভব, সেটি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে, আপনি ইরেশ যাকেরের নাম বলেছেন, এ রকম ছাড়াও আরও কিছু ক্ষেত্রে মামলা হয়েছে, আপনাদের কাছে একটা অনুরোধ করব, মামলাগুলো যারা করে, তাদের একটু খুঁজে বের করেন। খুঁজে বের করে মামলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তাঁদের উন্মোচন করেন। তাঁরা যদি কোনো হীন উদ্দেশ্যে, শক্রতামূলক উদ্দেশ্যে, অন্যের ব্যবসা, জায়গা-জমি দখলের উদ্দেশ্যে কিংবা চাঁদার উদ্দেশ্যে এ ধরনের মামলাগুলো করে থাকেন, আপনাদের প্রতি অনুরোধ তাঁদের ভ‚মিকা প্রকাশ করেন, জনগণের কাছে দেখিয়ে দেন। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে আরও কী ব্যবস্থা নেব, সারাক্ষণ এটা চিন্তাভাবনা করছি।’ এদিকে আইন মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বক্তব্যে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিচার কাজে বিড়ম্বনা কমানো, সময় বাঁচানো ও অর্থ ব্যয় কমানো তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য ইতিমধ্যেই তাঁরা বেশ কিছু সংস্কারকাজ করেছেন বলেও জানান। সংশোধনের কিছু উদাহরণ দিয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, দেওয়ানি কার্যবিধির যুগান্তকারী বেশ কিছু সংশোধন করা হয়েছে, যা উপদেষ্টা পরিষদে নীতিগতভাবে অনুমোদন হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের আগামী সভায় এটি চ‚ড়ান্ত অনুমোদন হতে পারে। আইন ও বিচার বিভাগের সচিব শেখ আবু তাহেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সেরা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সেরা প্যানেল আইনজীবীর হাতে সম্মাননাসূচক ক্রেস্ট তুলে দেন আইন উপদেষ্টা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার পরিচালক সৈয়দ আজাদ সুবহানী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার সহকারী পরিচালক (মনিটরিং) আরিফা চৌধুরী হিমেল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশে জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্র্যাস্টার, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল আজিজ আহমদ ভ‚ঞা, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের বøাস্ট) অনারারি ডিরেক্টর ব্যারিস্টার সারা হোসেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচারিক কাজে নিয়োজিত বিচারকবৃন্দ, বিভিন্ন দ‚তাবাস ও ইইউ’র ক‚টনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ক‚টনীতিবিদ এবং আইন মন্ত্রণালয় ও লেজিসলেটিভ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে এইডের মাধ্যমে প্রতিকার পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৩১১ জন বিচারপ্রার্থী। বিকল্প বিরোধের মাধ্যমে ৩০ হাজার ১৬৬টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে ৩২ হাজার ১৬৬টি।


আপনার মতামত লিখুন