শুকনো মওসুমে পদ্মায় তীব্র ভাঙনের সাথে ভাঙ্গছে শত শত মানুষের স্বপ্ন নদীগর্ভে হাজার হাজার বিঘা জমি

ইশতিয়াক আহম্মেদ, কুষ্টিয়া প্রতিনিধিঃ
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনের ও৷ পাড় ঘেঁষে মাটি কাটার ফলে শুকনো মৌসুমে পদ্মানদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ১০থেকে১৫ দিনের ব্যাবধানে দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নে কোলদিয়াড়, মাজদিয়াড় ও ভুরকা এলাকার মানুষের হাজার হাজার বিঘার বেশি বাগান ও ফসলি জমি সহ বেশকিছু ঘর বাড়ী নদী র গর্ভে বিলীন হয়েগেছে।এতে করে হুমকির মুখে রয়েছে একদিকে ভুরকা রায়টা- অন্য দিকে ফিলিপ নগর, ইউনিয়ন সহ মহিষকুন্ডির বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ,এছাড়াও, ভারত-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সঞ্চালন করার জন্য লাইন,ও সরকারি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন স্থাপনা।মনে করেন নদী ভাঙ্গনের শিকার সাধারণ জনগন।
নদী ভাঙ্গনের শিকার ভূক্তভোগিরা জানান, বর্ষা মৌসুমে বন্যার পানির সময় সাধারণত পদ্মা নদীর ভাঙ্গন দেখা যায়। কিন্তু এবার শুকনো মৌসুমেই পদ্মা নদীর ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়াড়-কোলদিয়াড় গ্রাম থেকে ভুরকা-হাটখোলাপাড়া গ্রাম, ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে শত শত বিঘা ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা। হঠাৎ করে ফসলি জমি হারিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
গত দুই সপ্তাহে ব্যাবধানে অন্তত ৩ হাজার বিঘারও বেশী তর বাড়ী সহ ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েগেছে।
এভাবে ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে যে কোন সময় ভারত-বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন খুঁটি নদীর গর্ভে বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া হুমকিতে রয়েছে রায়টা-ফিলিপ নগর- মহিষকুন্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রন বাধ।
এলাকাবাসীরা জানান, রাজশাহী-কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চরাঞ্চল দিয়ে পদ্মানদী প্রবাহমান রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পদ্মায় বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে নদী পেরিয়ে বিস্তীর্ণ চর ও নদীর দু’পাশের চঞ্চাল প্লাবিত হয়। বন্যার পানি বৃদ্ধি ও পানি কমার সময় সাধারনত নদী ভাঙ্গন দেখা দেখাগেলেও। এখনকার চিত্র অন্য। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে বন্যার পানি কমে গেলে শুরু হয় শুকনো মৌসুম। পদ্মার বুক চিরে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ চর। শুকনো মৌসুমে মুল নদী দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। যুগ যুগ ধরে একই ধারা চলে আসছে। কিন্তু এই মৌসুমে হঠাৎ করে পানির প্রবাহ মুল নদী পেরিয়ে প্রবল গতিতে নদীর কিনারের দিকে ধেয়ে এসে পাড়ে আছড়ে পড়ছে। ফলে মরিচা ইউনিয়নের কোলদিয়াড় থেকে ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াহ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে।
এলাকাবাসী বলেন, এ বছর শুকনো মৌসুমে নদীর পানির প্রবাহের দিক পরিবর্তন হচ্ছে কেন? এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই পদ্মানদীতে বৈধ ”সরকারী কোন ইজারাভুক্ত” বা, বালু মহাল না থাকলেও সরকার দলীয় প্রভাবশালীরা স্থানিয় কিছু লোক প্রশাসনের নাকের ডগায়, অবৈধ ভাবে অপরিকল্পিত ভাবে নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে ব্যাপক হারে বালু উত্তোলন করেছেন। দেখার কেই নাই এর ফলে পানির গতিপথ পরিবর্তন হয়ে নদী ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। এছাড়াও উত্তোলিত বালু বহনের জন্য বড় বড় কার্গো বা ট্রলার ব্যবহার করা হয়। এসব কার্গো বা ট্রলার নদীপাড়ের পাশ দিয়ে চলাচলের সময় নদীতে ব্যাপক ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। এতে করে নদী ভাঙনের তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আলহাজ্ব মোঃআসলাম হোসেন জানান, প্রতিবছর নদী ভাঙ্গেও এবারের নদী ভাঙনের ভয়াবহ তীব্রতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে উঠতি ফসল ধান, গম, ভুট্টা, মসুর, খেসারিসহ ফসলি জমি ও বিস্তীর্ণ এলাকা।
মরিচা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, পদ্মার ভাঙনে তার ইউনিয়নের অনেকে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া না হলে ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। নদী ভাঙ্গন রোধে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহনের অনুরোধ করেন তিনি।
মরিচা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ আলমগীর বলেন, যারা পদ্মানদীর ভাঙনরোধে মানববন্ধনে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারাই পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করছে। পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে অচিরেই মরিচা ইউনিয়নের ৩টি ওয়ার্ড মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ নুরুল ইসলাম জানান, অসময়ে পদ্মানদীর ভাঙ্গনে মরিচা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের ৪শতাধিক হেক্টর আবাদি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের সহায়তা ও নদী ভাঙ্গনরোধে সংশ্লিষ্ট দপ্তর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে।
পদ্মার ভাঙ্গনরোধের বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল জব্বার বলেন, নদী ভাঙ্গন রোধ করতে সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন তৎপর রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
তবে কোন আশ্বাস নয়, ভাঙনের শিকার পদ্মারপাড়ের মানুষের দাবি ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হোক। এমনটাই দাবি নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো অসহায় মানুষের।


আপনার মতামত লিখুন