দালাল চক্রের লোভনীয় অফারে প্রতারিত হয়ে পথে বসতে চলেছে অসংখ্য পরিবার

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, ২:০৩ পূর্বাহ্ণ
দালাল চক্রের লোভনীয় অফারে প্রতারিত হয়ে পথে বসতে চলেছে অসংখ্য পরিবার

সাম্প্রতিক সময়ে মানব পাচার
(সঠিকভাবে মনিটরিং করা এখন সময়ের দাবি)
এম কে তালুকদার
ইউরোপের টার্নিং পয়েন্ট এবং মাফিয়া দালাল চক্রের অভয়াশ্রম খ্যাত লিবিয়া থেকে মানুষ খেকো ভূমধ্যসাগরের গভীর নোনা জলে প্রতিদিন একের পর এক নৌকা ডুবে অকালেই হারিয়ে যাচ্ছে জীবিকার তাগিদে ইউরোপের স্বপ্ন নিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য প্রাণ। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ ইং থেকে ২০২১ ইং পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রায় ২২,২৪,২৪৫ জন ভয়ানক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে গভীর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আসে। আর এভাবে আসতে গিয়ে সাগরের নোনা জলে প্রাণ হারায় প্রায় ২১,৭০৭ জন।
এদিকে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে জুন মাসের সর্বশেষ তথ্যমতে এভাবে যারা ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন, তার অধিকাংশ ই বাংলাদেশি নাগরিক।
এছাড়াও ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক গবেষণা অনুযায়ী ২৬ থেকে ৪০ বছর বয়সিরা সবচেয়ে বেশি ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে ৩১ থেকে ৩৫ বছরের মানুষ সবচেয়ে বেশি। গত কয়েক বছরে ইউরোপ ও লিবিয়া থেকে ফেরত আসা ২,২৮৪ জনের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, ঢাকা, নোয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা এসব জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ এভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এভাবে ইউরোপে যেতে জনপ্রতি ৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের মতে, ‘এটি মানবপাচারের জন্য একটি ভয়ঙ্কর চিত্র।’
তাছাড়া বাংলাদেশের প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা সিলেটের ৩৭ জন তরুণদের নিহত হওয়ার করুণ কাহিনী আমাদের আবারো সেই ভয়াল ভূমধ্যসাগরের কথা মনে করিয়ে দেয়।
২০১৯ সালের মে মাসের ৫ তারিখ ভূমধ্যসাগরে ইটালি গামী যে প্লাস্টিক বোটটি ডুবে গিয়েছিলো সেখান থেকে ভাগ্যক্রমে কয়েকজন সিলেটি তরুণ বেঁচে যান, আর এদেরই কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আজকের প্রতিবেদন। আমরা সকলেই কমবেশি জানিযে বাংলাদেশে ব্যাঙ্গের ছাতার মতো নামে/বেনামে অসংখ্য ট্রাভেলস ব্যবসায়ী রয়েছেন, যাদের অধিকাংশেরই রিক্রুটিং লাইসেন্স নেই। সরকারের তালিকাভুক্ত নিবন্ধিত এজেন্সি হলো মাত্র ১২০০ টি। আর মুলত এই দালালরাই লোভনীয় অফারের মাধ্যমে সরলপ্রাণ তরুণদের অাকৃষ্ট করে অবশেষে অবৈধপথে মূলত তাদের গডফাদার মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেয়।আর মাফিয়া দালালরা চালায় করুন নির্যাতন এবং নির্যাতন থেকে বাঁচতে অবশেষে বাংলাদেশে অবস্থানরত মানবপাচারকারী দালালরা বন্ধী তরুনদের পিতা মাতা অাত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে বড় অংকের চাঁদা নেয়। কিন্তু তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। বেশির ভাগই সাগরের লোনা জলে ভাসতে ভাসতে অবশেষে কুমির কিংবা হাঙরের খাদ্যে পরিনত হয়। আর খুব কম সংখ্যক তরুনই ভাগ্যক্রমে সহায়তায় অবশেষে সাগর তীরবর্তী কোন দেশে ভিখারির মতো শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। আমাদের সিলেটে প্রচলিত আছে বিদেশ মানে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার জন্য সিলেটের তরুনরাই বেশি আগ্রহী। তাছাড়া প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে জিন্দাবাজার এর এহিয়া ট্রাভেলস এবং বিশ্বনাথ উপজেলার কাঠলীপাড়া গ্রামের মৃত চমক আলীর পুত্র রফিকুল ইসলামের লিবিয়া হয়ে ইটালী লোক পাঠানোর অনেক অভিজ্ঞতা ও সুনাম ছিলো বটে। কারণ রফিকের দুই ছেলেই লিবিয়া থাকতো এবং সূত্রমতে বড় ছেলে পারভেজ এর সেখানকার মাফিয়াদের সাথে ভালো সম্পর্ক ও ছিলো। আর মূলত সেই সুবাদে বাংলাদেশে পারভেজ এর পিতা রফিকুল ইসলাম সরকারি নিয়মনীতির কোন তোয়াক্কা না করেই বড় লোক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে লেগে যান মানবপাচার তথা দালালীর ব্যবসায়। প্রথম প্রথম তিনি কয়েকজন লোক পাঠিয়ে সফলও হন এবং এক পর্যায়ে সিলেটের সেই রফিকের দালালি এবং লিবিয়া অবস্থানরত তার দুই ছেলের সহায়তায় একে একে সিলেটের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণরা এসে পাসপোর্ট জমা দিতে থাকে স্বপ্নের দেশ ইউরোপ যাওয়ার আশায়। এবং সেই তরুণদের বলা হয় তোমাদেরকে সাগরপথে নয় বরং আকাশপথে কয়েকটি ফ্লাইটের মাধ্যমে বিমানে পৌঁছানো হবে কিন্তু টাকা লাগবে ১০-১২লক্ষ, কী আর করা গ্রামের সহজ সরল ছেলে অবশেষে রাজী হয়ে কিছু টাকা ও পাসপোর্ট জমা দেয় দালাল নামক মানবপাচারকারী রফিকের কাছে। শুরু হয় দিনগুনার পালা, ১/২/৩ মাসের মধ্যে ডাক পড়ে ভিসা হয়ে গেছে, টাকা নিয়ে আসো আগামী (?) তারিখ তোমার ফ্লাইট।
স্বপ্নের দেশের লোভনীয় হাতছানী, কী আর করা, অবশেষে জমানো টাকা, জায়গা বিক্রি অথবা সোনার গহনা বা গরু/মহিশ বিক্রি করে দালালের কাছে টাকা দিয়ে একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মা বাবার পা ধরে শেষ সালাম করে বাড়ি থেকে বের হয় এক স্বপ্ন বিভোর তরুন। কিন্তু সে জানে না যে এখানকার দালালরা তাকে মাফিয়ার কাছে বিক্রি দিয়েছে এবং তার আর বাড়ি ফেরা হবে না। এ যেনো শেষ বিদায়, শেষ কৃত্ত, শেষ লক্ষ, হায় নিয়তি!!
এদিকে দিনের পর দিন সেই বিদেশগামী তরুণের পিতা/মাতা ভাই বোন বার বার যোগাযোগ করেব, দেশে অবস্থানরত সিলেটের বিশিষ্ট দালাল/পাচারকারী রফিকুল ইসলামের সাথে কিন্তু অধিকাংশ সময়ই তার ফোন বন্ধ থাকায় অবশেষে তার বিশ্বনাথ উপজেলার কাটালীপাড়ার বাড়িতে আসেন কেউ কেউ। কিন্তু তার পরেও ফলাফল জিরজিরো, মানে ছেলে নিখোঁজ!! অথবা লিবিয়া মাফিয়ার হাতে বন্ধী!! দিতে হবে মুক্তিপন নতুবা ছেলেকে হত্যা করা হবে। অবশেষে ছেলের জীবন বাঁচাতে বৃদ্ধ পিতা মাতা দালাল রফিকের মাধ্যমে আবারও সেই মুক্তিপণের টাকা দিয়ে দেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি!!
হঠাৎ একদিন খবরের কাগজে বড় শিরোনাম হয় লিবিয়া থেকে ইতালী যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে বাংলাদেশী তরুনের মৃত্যুর খবর।। মা বাবার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ে, আবারো শুরু হয় দালালের নাম্বারে কল দেওয়া, কিন্তু মোবাইল তো বন্ধ!!
অবশেষে খবর আসে রেজুয়ানুল ইসলাম খোকন, সাব্বির আলম, সাজু মিয়া, মোঃ মুমিন, সোহেল রানা(জীবিত ফেরত), মাছুম আহমেদ (জীবিত ফেরত), আহমদ বেলাল( জীবত ফেরত) সহ নাম না জানা অনেকে… আর সাম্প্রতিক সময়ে ভূমধ্যসাগরে একাধিক নৌকাডুবি এবং অসংখ্য নিহতের খবর সত্যি সত্যিই খুব কষ্ট ও বেদনার নীল নির্যাসমিশ্রিত একখণ্ড নীল শোক বৈ কিছু নয়।
তাই আমাদের উচিত পরিবারের একজন অভিভাবক হিসেবে যাছাই বাছাই করে এবং সরকারের নির্ধারিত এজেন্সির মাধ্যমে বৈধ ভাবে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্তা করা।
তাছাড়া বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভূঁইফোড় ও অবাঞ্ছিত ট্রাভেল এজেন্সী ও দালাল চক্রের গডফাদারদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং দেশের প্রতিটি জেলায় বিদেশ যাত্রী ও মানব পাচারকারী দালাল চক্রের মনিটরিং করা।