নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্তে¡ও শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং ১৩টি শ্রম আদালতে মামলাজট কমছে না। মামলার তুলনায় নিষ্পত্তি কম হওয়ায় বাড়ছে জট। আইন অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে শ্রম আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। তবে ১৩টি শ্রম আদালতে ৬ মাসের বেশি হয়েছে এমন ১৩ হাজার ৪০২টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। শ্রম মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত মার্চ মাসে সব শ্রম আদালত ও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা ছিল ২২ হাজার ৭৩৭টি। ওই মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ৭৮৮টি মামলা। এর মধ্যে ৬টি বিভাগীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন ৫০৫টি মামলা। দেশের সব শ্রম আদালতে বিচারাধীন ছিল ২১ হাজার ৬১টি মামলা। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, বিচারক সংকট, মামলা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ব্যবহার না করা এবং আইনজীবী ও মালিকপক্ষের বারবার সময় নেওয়ার প্রবণতার কারণে মামলা নিষ্পত্তির গতি কমে গেছে।
ঢাকার আদালতে ভয়াবহ জট : পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতে শ্রমিকদের করা ১০ হাজার ৫৮৯টি মামলা ঝুলে রয়েছে। মার্চ মাসের তথ্যানুযায়ী, ঢাকার ১ম শ্রম আদালতে বিচারাধীন ৪ হাজার ৬৭৬টি মামলা। ওই মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৭১টি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন যথাক্রমে ৩ হাজার ২৯৯ এবং ২ হাজার ৬১৪টি মামলা। নিষ্পত্তি হয়েছে যথাক্রমে ১২৫ ও ৭৩টি।
চট্টগ্রামের চিত্র অনেকটা একই রকম। প্রথম শ্রম আদালতে ১ হাজার ৩৭৬টি এবং দ্বিতীয় আদালতে ৫৫৪টি মামলা বিচারাধীন। চট্টগ্রামে মোট বিচারাধীন ১ হাজার ৯৩০টি মামলার মধ্যে মার্চ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি। ওই মাসে হয়েছিল ৫২টি মামলা। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ শ্রম আদালতে ২ হাজার ১৩৩টি এবং গাজীপুরের শ্রম আদালতে ৫ হাজার ৫২৮টি মামলা বিচারাধীন। মার্চ মাসে এ দুই আদালতে নিষ্পত্তি হয় ৪২৩টি মামলা; একই সময়ে করা হয়েছিল ২০৮টি মামলা।
অন্য ৬টি বিভাগীয় আদালত : বর্তমানে খুলনায় ৯১টি, রাজশাহীতে ৭৩, রংপুরে ৭৫, সিলেটে ৪৮, কুমিল্লায় ১৫২ এবং বরিশালে ৬৬টি মামলা বিচারাধীন। এ ৬টি বিভাগীয় শ্রম আদালতে সব মিলিয়ে বিচারাধীন ৫০৫টি মামলা।
শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালেও ঝুলছে অনেক মামলা : শ্রম আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার রায় বা যে কোনো আদেশের বিরুদ্ধে মালিক বা শ্রমিকের আপিল করার সুযোগ আছে। এজন্য আইন অনুযায়ী ঢাকায় গঠিত হয়েছে একমাত্র শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল। একটি মাত্র ট্রাইব্যুনাল থাকায় দেশের বিভাগীয় বা জেলা আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হলেও এর বিরুদ্ধে আপিল দায়ের বা শুনানির জন্য সংক্ষুব্ধ পক্ষকে (মালিক বা শ্রমিক) ঢাকায় আসাতে হয়। তবে অনেক শ্রমিকই ঢাকায় এসে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেত উৎসাহী হন না। আবার মামলা জটের কারনেও শ্রম আদালতে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে শ্রমিকদের। একইভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রম আদালত ও আপিল ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়ে বছরের পর বছর মামলা ঝুলিয়ে রাখে। এতেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় এবং শ্রমিকরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ১ হাজার ২২৩টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৪১টি মামলা হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। এ ছাড়া ৬ মাসের বেশি হয়েছে এমন মামলা শ্রম আপিল ট্রাইবুন্যালে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে ৮২২টি।
জনবল সংকট : আপিল ট্রাইব্যুনাল ও ১৩টি শ্রম আদালতে বর্তমানে ৫৮টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ৭টি শ্রম আদালতে রেজিস্ট্রারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। তাই এসব আদালতে আদেশের অনুলিপি সংগ্রহ, মামলা করা, কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্তি করাসহ নানা ক্ষেত্রে মামলা-সংশ্লিষ্টদের ভোগান্তি হচ্ছে। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, শূন্য পদ পূরণে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-এর আইন উপদেষ্টা (অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ) এসএম রেজাউল করিম বলেন, ‘শ্রম মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মালিক ও শ্রমিকপক্ষকে সচেতন হতে হবে। আইনে বলা আছে, সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। বাস্তবে তা হয় না। আইনজীবীরাও মামলা দীর্ঘায়িত করেন। অনেক সময় শ্রমিকপক্ষ উপস্থিত থাকে, অথচ মালিকপক্ষ বারবার সময় নেয়।’ তিনি আরও বলেন, শ্রম আইন সংশোধনের বিষয়টিও দীর্ঘদিন ঝুলে আছে। এটি দ্রæত হওয়া প্রয়োজন।’
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে ১৯১৩ মামলা। বছরের পর বছর ঝুলছে মামলা, ৬০ দিনে মামলা নিষ্পত্তির কথা থাকলেও হচ্ছেনা। চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা করেন সজল শীল নামের এক শ্রমিক। ২০২০ সালে করা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ এখনও শেষ হয়নি। কবে নাগাদ মামলাটি নিষ্পত্তি হতে পারে তার সঠিক ধারণা নেই বাদীপক্ষের আইনজীবীর। বকেয়া মজুরির দাবিতে চট্টগ্রাম নগরের ‘সি টেক্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভুগী। এভাবে চট্টগ্রামের দুটি শ্রম আদালতে বছরের পর বছর ঝুলছে প্রায় দুই হাজার মামলা। এগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন শ্রমিকরা।
শ্রম আদালত সূত্রে জানা যায়, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার আদায়ের শেষ ভরসাস্থল হিসেবেই গঠন করা হয়েছিল শ্রম আদালত। নগরের পাঁচলাইশ এলাকায় অবস্থিত দুটি শ্রম আদালতে ঝুলছে এক হাজার ৯১৩টি মামলা। এর মধ্যে প্রথম শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এক হাজার ৩৬৫টি এবং দ্বিতীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫৪৮টি। শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এসব মামলা বিচারাধীন। চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের দেওয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ লাখ। শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করতে পারেন শ্রমিকরা। আইন অনুযায়ী শ্রম আদালতে মামলা করার ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হয়। এ সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করা না গেলে আরও ৯০ দিন সময় নেওয়া যায়। তবে সেক্ষেত্রে উপযুক্ত কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে এমন বেশ কিছু মামলা আছে, যেগুলো বছরের পর বছর ধরে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আদালত সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে বিশেষ করে চাকরির ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরাই বেশি মামলা করে থাকেন। বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করা, চাকরি পুনর্বহাল, বকেয়া মজুরি আদায়, যেকোনো ধরনের পাওনাদি আদায় ও চাকরি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে শ্রম আদালতে মামলা করা যায়। এ ছাড়া কোনও প্রতিষ্ঠান বা কারখানার মালিক বা কোনও শ্রমিক শ্রম আইনের আদেশ পালন না করলে বা লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন সংক্রান্ত মামলাগুলো করা হয় শ্রম আদালতে।
২০২৩ সালে করা কয়েকটি মামলা আছে, যেগুলোর এখন পর্যন্ত জবাবও দাখিল হয়নি উল্লেখ করে একজন বলেন, ‘এর মধ্যে একটি মামলায় ধার্য তারিখ ছিল গত ১ জানুয়ারি। এরপর এই মামলায় পরবর্তী ধার্য তারিখ পড়ে গত ২৪ এপ্রিল। অর্থাৎ দুই মাসের বেশি সময় পর একেকটি মামলার ধার্য তারিখ পড়ছে। এতে করে মামলার দীর্ঘস‚ত্রতা বাড়ছে। ২০১৭ সালের অনেক মামলাও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।’
চট্টগ্রাম প্রথম শ্রম আদালত সূত্রে জানা যায়, ‘৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এক হাজার ৩৬৫টি। এর মধ্যে কিছু মামলায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ আছে। নানা কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা যায় না।’
চট্টগ্রাম দ্বিতীয় শ্রম আদালত সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে এই আদালতে ৫৪৮টি মামলা বিচারাধীন আছে। গত এক বছরে এই আদালতে ২৩৪টি মামলা করা হয়েছে। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৯৮টি।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মাহমুদা বেগম স্বাধীনা
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী : তৌহিদুর রহমান হিসান
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৪৭/৭/এ, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী (যাত্রাবাড়ী মোড়ের ডান দিকে ওয়াপদা কলোনীর বিপরীতে মুন সিএনজি'র সাথের সাংবাদিক গলি) ঢাকা-১২০৪।
মোবাইলঃ ১৩১৬-২০২১৩৭, ০১৬৩২-৩৬৭৬৪৫, ০১৬৮৬-৯০৭৭১২ অফিসঃ ০১৯৮৯-৬০৩৯০৪, ০১৬৩২-৩৬৭৬৪৫ (বিজ্ঞাপন)।
ই-মেইল : shadhindesh1999@gmail.com