একাকিত্ব, স্বার্থপরতায়, ও অবহেলায়

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, ২:৩৫ পূর্বাহ্ণ
একাকিত্ব, স্বার্থপরতায়, ও অবহেলায়

একাকিত্ব, স্বার্থপরতায়, ও অবহেলায়

তৌহিদুর রহমান হিসান

বুধবার রাত পৌনে ১০টা। নিজের বাসা থেকে ফেসবুক লাইভে আসেন ব্যবসায়ী মহসিন খান। এই লাইভের ১৬ মিনিটের দিকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেন মহসিন খান। খুব হৃদয়বিদারক একটি দৃশ্য। ভিডিওটির পিছনের গল্প সত্যি খুব মর্মান্তিক। তার কথাগুলো আমার কাছে আত্মহত্যার চেয়ে ভয়াবহ লেগেছে। একটি আত্মহত্যা নাড়িয়ে দিলো সবাইকে। লাইভে এসে জলজ্যান্ত একজন মানুষ সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে, দোয়া-দুরুদ পড়ে, মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে নিজের জীবন শেষ করে দিচ্ছেন। ফেসবুক লাইভে আত্মহত্যা করার আগে সব কষ্টের কথা, নিজের বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা এবং পরিবার নিয়ে হতাশার কথা জানান আবু মহসিন খান। আত্মহত্যার আগে তার বলে যাওয়া কথা প্রতিটি হৃদয়ে দাগ কেটেছে ! আবু মহসিন খানের আত্মহত্যার ঘটনাটা হৃদয়ে একটু নাড়া দেয়ই। মানুষ হিসেবে তার অসহায়ত্ব, অবহেলার প্রতি একটু সহানুভ‚তি চলেই আসে। এই ঘটনা বাংলাদেশের মানুষকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। কেউ কেউ লাইভে আত্মহত্যার সেই দৃশ্য দেখে হতবাক এবং বিচলিত হয়েছেন। অনেকে কেঁদেছেন। রাতভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটাই ছিল প্রধান খবর। একজীবনে একবুক হাহাকার, শূন্য হৃদয়ের একজন মানুষকে কোথায় ভাসিয়ে নিতে পারে, তা মাত্র ১৬ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে তিনি বর্ণনা করেছেন।
জীবনের এত কঠিন বাস্তবতার নিখাদ বর্ণনা আর হতে পারে না। এ কেমন অসহায় ভাষ্য। জানি না আর কখনো শুনব কি না। জীবনই মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। অথচ মৃত্যুর আগে নোটবুকে লিখে গেছেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়’।
মহসিন খানের কষ্ট বোঝার কেউ ছিল না। মহসিন খানের কষ্টের কথা, অবহেলার কথা খুব বুঝতে পারি আমরা। এমন কষ্টে যাদের হৃদয় আছে তাদের চোখ গড়িয়ে তো জল আসেই। অনেক কষ্ট তার বুকে চাপা ছিল। এমন অভিজ্ঞতা কারও জীবনে না আসুক। মহসিন খানের কষ্ট বোঝার কেউ ছিল না। এমন হাজারো মহসিনের বাস বাংলাদেশে। এটা মহসিনের একার গল্প নয়, হাজারো অবহেলা আর কষ্টের গল্প। প্রায় সব হারিয়েছেন, প্রতারিত হয়েছেন বন্ধু-বান্ধবদের কাছে। কষ্ট পেয়েছেন পরিবারের লোকদের কাছেও। ফেসবুক লাইভে কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যান, আর কিছু বলতে পারছিলেন না। চোখ গড়িয়ে জল ঝরছিল। কষ্টটা বোধহয় অনেক বেশিই ছিল তার। এক সময় কান্না চেপে বলতে শুরু করেন- ‘আমার এক ছেলে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। আমি ক্যান্সার আক্রান্ত। ফ্ল্যাটে একাই থাকি। আমার ভয় করে যে আমি বাসায় মরে পড়ে থাকলে, লাশ পচে গেলেও কেউ হয়তো খবর পাবে না…।’ কতটা অবহেলা আর গুরুত্বহীন হয়ে মহসিন খান এসব কথা বলছিলেন। মহসিনের কষ্ট বোঝার কেউ কি ছিল না? ভাবতেই কেমন লাগছে। ঢাকার বাসায় একা থাকেন জানিয়ে মহসিন বলেন, ‘একা থাকা যে কি কষ্ট যারা একা থাকে তারাই একমাত্র বলতে পারে বা বুঝে। আমার আসলে এখন আর পৃথিবীর প্রতি, মানুষের প্রতি…।’

সুন্দর পৃথিবী, ভালোবাসা ও মায়ায় জড়ানো।  তবুও যেন দিন দিন নিষ্ঠুরতায় আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। ঢেকে যাচ্ছে স্বার্থপরতায়। ভালোবাসাহীনতায় বড্ড কঠিন হয়ে দূর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে জীবনের পথচলা !  

– তৌহিদুর রহমান হিসান

মহসিন খানের কষ্টে কথা, অবহেলার কথা খুব বুঝতে পারি আমরা। আসলে মহসিন খানের কষ্ট বোঝার কেউ ছিল না। এ গল্প এদেশের দেড় কোটি প্রবীণের গল্প। যারা মহসিনের মতো আত্মহত্যা করতে পারেন না। নীরবে চোখের জল ঝরান। আপনার আমার অনেকের মনের কথাগুলো বলে গেলেন মহসিন খান। শূন্যতায় ডুবে ডাচ্ছে সব !! মনের কথা মন খুলে কলা হয়ে উঠছে না আপনজনকে, কোননা আপনজনরা যেন শুধুই সুসময়ের সঙ্গী; দুঃসময়ের পাশে নাই। তবু তাদের পাশে পাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটে আমাদের। বেদনার, দুঃখের, কষ্টের-এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবু এ সত্য আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। একজন মানুষ যে কত একা, তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মহসিন খান। মাঝে মাঝে মনে হয় মহসিন সাহেবের কথাগুলো, ‘পৃথিবীতে আপনিই আপনার। ছেলে বলেন, মেয়ে বলেন, স্ত্রী বলেন কেউই আপনার না’। আবু মহসিন খানের কথাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিছু জিনিস খুবই কষ্টের, অপমানের ও খুব বেদনাদায়ক। যেটি হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
মহসিন খানের ছোট ভাই আবু হাসান মো. ওয়াহিদুজ্জামান লিপু বলেন, ‘ওনার একাকিত্ব ওনাকে খেয়ে ফেলেছে। মানুষ একা বাঁচতে পারে না। একটা মানুষ তিন থেকে চার বছর একটা ফ্ল্যাটে একা থাকেন। তার ওয়াইফ, ছেলে দেশের বাইরে। মহসিন খান অনেক কষ্ট নিয়ে আত্মহনন করে পৃথিবী ছেড়েছেন। শেষ বিদায়েও তিনি ছেলে-স্ত্রীকে কাছে পাননি।
আত্মহত্যা মহাপাপ। আত্মহত্যাকে আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারি না। আত্বহত্যা কখনই কোন সমস্যার সমাধান হতে পারেনা। তবুও মানুষ করে ফেলে, সে ভাবে সে বুঝি মুক্তি পেয়ে গেল !!
না পাওয়ার বেদনায় আশাহত জীবনে অভিমান জমতে জমতে পাহাড়সম হতশায় কালো মেঘে ঢেকে যায় জীবনের আনন্দ। ফেলে আসা সেই সুময়ের দিন গুলো ফিরে পাওয়ার আক্ষেপে দিনগুলো কেটে যায়। সময় থাকতে আমরা প্রিয় মানুষকে ভালোবাসি। ভালোবাসার মানুষটির পাশে থাকার মতো মন হোক আমাদের, সুখে-দঃখে, সুসময়ে কিংবা দুঃসময়ে আমরা আপনজনরা এক অপরের পাশে মায়ার বন্ধনে অবিচল থাকার অঙ্গিকার নিয়েই প্রিয়জনদের ভালোবাসতে চাই। সব নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্ত হতে চায় মন, খাঁচায় বন্দী থাকা ঐ পাখির মতন। হয়রে জীবন !!
ভালোবাসলেই ভালোবাসা পাবে, এটা ভাবা ভুল ! কারন দুনিয়ার মানুষগুলো স্বার্থপর, শুধুই নিতে জানে দিতে না। এই শহরে আপন বলে শুধু নিজের ছায়া !!
তাই ভালোবাসা হোক নির্মল, নিঃস্বার্থ, আমরন… অস্থির পথচলা একসময় পালাতে চায় জীবন থেকে, হার মানে সব যুক্তির কাছে। মনে হয়-সব সুখ বুঝি ওপারে !

লেখকঃ-

তৌহিদুর রহমান হিসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
দৈনিক স্বাধীন দেশ