দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের বহু আলোচিত মামলার বিচার সম্পন্ন হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্যগ্রহণে জটিলতা এবং উচ্চ আদালতে শুনানি বিলম্বিত হওয়ার কারণে বিচার কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সাক্ষীর অনুপস্থিতি, প্রমাণগত দুর্বলতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘস‚ত্রতার কারণে দিন দিন বাড়ছে মামলাজট। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে ৪২ হাজারের বেশি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থাৎ মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ২৩ শতাংশ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে, যা বিচারপ্রত্যাশীদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা ১০১টি। এসব আদালতে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি করে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল সংখ্যক মামলার তুলনায় আদালতের সংখ্যা এখনো অপ্রতুল। ফলে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা এবং মামলাজট কমানো বিচার বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় থাকা ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের মধ্যে সময় পার করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা কার্যত এক ধরনের ‘আইনি অচলাবস্থার’ মধ্যে আটকে পড়েছে। তবে দীর্ঘদিনের এই বিচারজটের মধ্যেই স্বস্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে হাইকোর্ট বিভাগে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত শুনানির জন্য গত রবিবার থেকে হাইকোর্টে একটি বিশেষ বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর এ সংক্রান্ত মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল হাইকোর্টে দ্রুত শুনানির জন্য গত রবিবার আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। এরপর প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের সিদ্ধান্ত জানান এবং গত রবিবার থেকে সেই বেঞ্চের বিচারিক কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেন। পরে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান অ্যাটর্নি জেনারেল। বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে নেওয়া এ উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ আদালতে আটকে থাকা মামলাগুলোর নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে, বিচারপ্রত্যাশী ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে, এই বিশেষ বেঞ্চের প্রথম রায় দিয়েছে। যশোরের স্ত্রী হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বামী খালাস। তদন্তে দুর্বলতা ও যথাযথ সাক্ষ্য না থাকায় যশোরের অভয়নগরে ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে স্ত্রী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বামী আব্দুল্লাহকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত মঙ্গলবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স খারিজ করে এ রায় দেন। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০১৯ সালে আসামি আব্দুল্লাহকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন যশোর নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল-১। নিয়ম অনুসারে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। পর আসামি জেল আপিল করেন। ১০ জুন প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু মামলায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠন করেন। সেই বেঞ্চে ১৪ জুন এ মামলার শুনানি শুরু হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন আলোচিত ঘটনার পর ৪৪টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে। তবে এসব মামলার অধিকাংশেই দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলার চাপ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের তদারকি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। একজন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ বলেন, মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিচারকরা দ্রুত নিষ্পত্তিতে সময় দিতে পারছেন না। এছাড়া অনেক মিথ্যা মামলা দায়ের হওয়ায়ও জট বাড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। আইন অনুযায়ী দ্রæত বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হচ্ছে না। বছরের পর বছর অপেক্ষা, আদালতের ধীরগতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার এখনো অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
ছবি-৫
আপনার মতামত লিখুন
Array