দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ভোলাকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে এবার বাস্তবায়নকেন্দ্রিক পদক্ষেপ চায় ভোলাবাসী। রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা মহাসড়ক নির্মাণের নতুন উদ্যোগ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়া সরাসরি বরিশাল–ভোলা সেতু—দুটি প্রকল্পকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার দাবি উঠেছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বড় সেতু নির্মাণে সময় লাগলেও অপেক্ষাকৃত দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সড়ক করিডরকে আগে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে সরাসরি বরিশাল–ভোলা সেতুর অর্থায়ন, পিপিপি প্রক্রিয়া, নকশা ও দরপত্রের কাজ দ্রুত শেষ করা গেলে দুটি উদ্যোগই পরস্পরের বিকল্প না হয়ে ভোলার যোগাযোগব্যবস্থার পরিপূরক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে।
দ্রুত কাজ শুরু করতে পারে রহমতপুর করিডর : ২২ আগস্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ হয়ে ভোলা পর্যন্ত মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত রুটে বিদ্যমান সড়ক প্রশস্তকরণ, প্রয়োজনীয় নতুন সড়ক নির্মাণ এবং তিনটি সেতু নির্মাণের কথা রয়েছে।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—রহমতপুর প্রান্তে বিদ্যমান সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। ফলে পুরো নতুন একটি মহাসড়ক শূন্য থেকে নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে পর্যায়ক্রমে কাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি জরুরি সমন্বিত সম্ভাব্যতা ও প্রকৌশল সমীক্ষা। এতে কোন অংশ বিদ্যমান সড়ক ব্যবহার করবে, কোথায় প্রশস্তকরণ প্রয়োজন, কোন কোন স্থানে সেতু বা কালভার্ট প্রয়োজন এবং কোথায় ভূমি অধিগ্রহণ লাগবে—এসব নির্দিষ্ট করতে হবে।
‘আগে সমীক্ষা, পরে বছর বছর অপেক্ষা’ নয় : ভোলাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি সময় চলে যায় সিদ্ধান্তের পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায়। তাই এবার প্রকল্পটিকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হলে একসঙ্গে কয়েকটি কাজ শুরু করা প্রয়োজন।
প্রথম পর্যায়ে রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা করিডরের পূর্ণাঙ্গ রুট ম্যাপ, প্রাথমিক ব্যয় ও ভূমি অধিগ্রহণের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। একই সময়ে পরিবেশগত ও নদীসংক্রান্ত সমীক্ষাও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
এরপর যে অংশে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন নেই বা কম, সেখানে প্রাথমিক সড়ক উন্নয়নকাজ আগে শুরু করা যেতে পারে। এতে পুরো প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা না করে কাজকে ধাপে ধাপে দৃশ্যমান করা সম্ভব হবে।
সরাসরি সেতুর কাজও থেমে থাকা উচিত নয় : অন্যদিকে সরাসরি বরিশাল–ভোলা সেতু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে নতুন করে শূন্য থেকে সবকিছু শুরু করার প্রয়োজন নেই।
সমীক্ষায় প্রস্তাবিত প্রকল্পের দৈর্ঘ্য, ব্যয়, ভূমি অধিগ্রহণ, নদীশাসন, অর্থনৈতিক সুফলসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করা হয়েছে। সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা এবং প্রকল্পটি পিপিপি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগও রয়েছে।
এ কারণে সেতু প্রকল্পে এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থায়ন ও বিনিয়োগকারী চূড়ান্ত করা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন দ্রুত সম্পন্ন করা এবং নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা।
এক প্রকল্পের জন্য আরেক প্রকল্প আটকে রাখা যাবে না : ভোলার যোগাযোগব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হবে—একটি প্রকল্পের কারণে অন্য প্রকল্প থেমে যাওয়া। রহমতপুর করিডর বাস্তবায়িত হলে ভোলা জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে একটি কার্যকর বিকল্প সংযোগ পেতে পারে। অন্যদিকে সরাসরি বরিশাল–ভোলা সেতু নির্মিত হলে বরিশালের সঙ্গে ভোলার সরাসরি যোগাযোগ স্থায়ী হবে।
দুটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও প্রভাব পুরোপুরি এক নয়। তাই কোনটি আগে হবে—এই বিতর্কের পরিবর্তে কোনটি কত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায় এবং কোনটি দীর্ঘমেয়াদে কী সুফল দেবে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
১০টি বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত
ভোলার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে দ্রুত অগ্রগতির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে—
১. রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা করিডরের জরুরি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করা;
২. পুরো রুটের চূড়ান্ত নকশা ও প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ;
৩. ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দ্রুত চিহ্নিত করা;
৪. প্রয়োজনীয় সেতু ও নদীশাসন কাজের প্রকৌশল নকশা তৈরি;
৫. বিদ্যমান সড়কের যেসব অংশ দ্রুত উন্নয়ন করা সম্ভব, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা;
৬. সরাসরি বরিশাল–ভোলা সেতুর পিপিপি প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া;
৭. দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা ও অর্থায়নের কাঠামো চূড়ান্ত করা;
৮. ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ ও নদীসংক্রান্ত অনুমোদন একই সময়ে এগিয়ে নেওয়া;
৯. দুটি প্রকল্পের জন্য আলাদা সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা;
১০. প্রতি তিন মাসে প্রকল্পের অগ্রগতি জনসম্মুখে প্রকাশ করা।
৩০–৫০ বছরের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত
ভোলার জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শুধু একটি রাস্তা বা একটি সেতু নির্মাণ নয়; আগামী কয়েক দশকের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা।
সরাসরি বরিশাল–ভোলা সেতু বাস্তবায়িত হলে ভোলার সঙ্গে বরিশালের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে ভোলা–লক্ষ্মীপুর স্থায়ী যোগাযোগও বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক করিডর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা মহাসড়ক বাস্তবায়িত হলে ভোলা সরাসরি জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে এবং মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা, মুলাদীসহ আশপাশের এলাকাও যোগাযোগ সুবিধা পাবে। এখন প্রয়োজন সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন ।
ভোলাবাসীর কাছে এখন আর শুধু নতুন ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সময়সীমা, অর্থায়ন ও দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি। সরকার চাইলে রহমতপুর করিডরের সমীক্ষা ও নকশার কাজ দ্রুত শুরু করে স্বল্পমেয়াদি যোগাযোগ সুবিধার পথ খুলতে পারে। পাশাপাশি সরাসরি বরিশাল–ভোলা সেতুর পিপিপি প্রক্রিয়া ও অর্থায়ন চূড়ান্ত করে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী যোগাযোগের কাজ এগিয়ে নিতে পারে। ফলে একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার অপেক্ষায় অন্য প্রকল্পকে আটকে না রেখে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই পরিকল্পনাই একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে ভোলার জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
ভোলাবাসীর প্রত্যাশা, এবার ঘোষণা নয়—প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও বাস্তবায়নের ধাপ ঘোষণা করা হবে। তাহলেই দীর্ঘদিনের ‘বিচ্ছিন্ন ভোলা’ ধীরে ধীরে পরিণত হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে।
এখন প্রশ্ন—কোন প্রকল্প আগে হবে, সেটি নয়; প্রশ্ন হলো, দুটির কাজ কত দ্রুত শুরু করা যায়।
আপনার মতামত লিখুন
Array